
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকালে এক ঘণ্টার মধ্যে দেশের ৬৩ জেলায় পাঁচশর বেশি বোমা ফেটেছিল। সেদিন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। একুশ বছর ঘুরে ২০২৬ সালের জুনে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, সেই একই রাজনৈতিক জুটি আবার ক্ষমতায়, আর অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের নিজস্ব হিসাবেই দেশের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্তত ৩৭০ জন নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়, নাকি ইতিহাসটাই আসলে বৃত্তাকার, সেই প্রশ্নটা এড়ানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
জেএমবির ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হুজি-বির ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, আল্লাহর দলের ৯ জনসহ সাতটি নিষিদ্ধ সংগঠনের ৩১১ জন এবং হিযবুত তাহ্রীরের আরও ৫৯ জন, মোট ৩৭০ জন উগ্রপন্থী এখন পলাতক। এটা কোনো বিরোধী মহলের বানানো অভিযোগ নয়, খোদ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটের এপ্রিল পর্যন্ত হালনাগাদ করা তথ্য। এত মানুষ কোথায় আছেন, কী করছেন, সেই খবর রাষ্ট্রের কাছে নেই কেন, প্রশ্নটা এখন সরাসরি ক্ষমতায় থাকা দলের দরজায় গিয়ে ঠেকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কাশিমপুরের হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে ২০২ বন্দী পালানোর সময় তাঁদের মধ্যে ৯ জন ছিলেন উগ্রবাদী মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। সেই বিশৃঙ্খল দিনের দায় একার কারো ঘাড়ে চাপানো যায় না। কিন্তু তারপর কেটে গেছে প্রায় দুই বছর, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসেছে সাড়ে চার মাস হতে চলল, আর এই ৯ জনসহ তিনশর বেশি মানুষের হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রযন্ত্র এখন কার হাতে, সেই প্রশ্নের জবাব একটাই।
গত ২১ মার্চ, মানে তারেক রহমানের সরকার শপথ নেওয়ার মাসখানেক পরই, জেএমবির প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান কাশিমপুর-২ কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে যান। যে সংগঠন একদিনে ৬৩ জেলায় বোমা ফাটিয়েছিল, তার শীর্ষ নেতা মুক্ত, আর এই মুক্তি ঘটেছে খোদ বিএনপি সরকারের আমলে। এটাকে নিছক আদালতের রুটিন কাজ বলে সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে চলবে, কোথায় নজরদারি বাড়বে, কোথায় ঢিলে দেওয়া হবে, সেই অগ্রাধিকার তো সরকারই ঠিক করে।
জুলাই দাঙ্গার পর জামিনে মুক্তি পাওয়া ১ হাজার ৬১১ জনের একজন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জসীম উদ্দিন রাহমানী গত অক্টোবরে ছাড়া পেয়েছেন। তাঁর নামে এখনো দুটি মামলা বিচারাধীন, একটা সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালে, আরেকটা সাইবার ট্রাইব্যুনালে। মুক্তি পেয়ে তিনি প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিচ্ছেন, নিজেকে সংগঠনের নেতা নন বলে দাবি করছেন, অথচ পুলিশের কাগজপত্রে তিনিই সেই সংগঠনের নেতা। এই দ্বিচারিতা নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যথা এখনো চোখে পড়েনি।
ইতিহাস ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় নিম্ন আদালত তারেক রহমানকে ষড়যন্ত্রের দায়ে দণ্ড দিয়েছিল। তিনি বরাবর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, রায় নিয়ে বিতর্কও আছে। কিন্তু যাঁর নাম সেই মামলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তিনিই আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী, আর তাঁর সরকারের আমলেই জঙ্গি নেতারা একে একে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এই মিলটুকু পাঠকের বিবেচনার হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভালো।
আর জামায়াতে ইসলামী? সংসদে এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম দল, ৬৮টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এই দলটি নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর আবার মূলধারার রাজনীতিতে ফিরেছে, অথচ দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই জঙ্গি সংকট নিয়ে সংসদে তাদের মুখ থেকে স্পষ্ট কোনো অবস্থান শোনা যায়নি। কট্টর ইসলামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে আদর্শগত নৈকট্য থাকা একটা দল যখন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি, তখন জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে তাদের এই নীরবতা নিছক কাকতালীয় মনে হয় না, প্রশ্ন তোলে।
২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গার সময় থানা আর কারাগার থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। একদিকে অস্ত্র সমাজে ছড়িয়ে আছে, অন্যদিকে দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতারা একে একে মুক্ত হচ্ছেন, এই দুইয়ের মিলন কোনো সুখকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয় না।